বিক্রম বেতালের গল্প। রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম। বুদ্ধির খেলা। TOP 1 NEW VIKRAM-BETAL STORY IN BENGALI.

Spread the love

আজ একটি বিক্রম বেতালের গল্প নিয়ে আমরা হাজির। এই গল্পে এক রাজকুমার কিভাবে তার বন্ধুর বুদ্ধির বলে রাজকুমারীকে পাশে পায় সেই গল্প বলা হয়েছে। গল্পের শেষে আমরা একটি শিক্ষণীয় কথাও জানতে পারব। তাই পুরো গল্পটি উপভোগ করুন।

বিক্রম বেতালের গল্প। রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম

কাশীতে প্রতাপ নামে এক রাজা বাস করত। তার ছেলের নাম ছিল বজ্র। একদিন রাজকুমার মন্ত্রীর ছেলের সাথে পাশের এক জঙ্গলে কিছুদিনের জন্য ঘুরতে গেল। জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে তারা একটি পুকুর দেখল। সেই পুকুরের জলে অনেক পদ্ম ফুল ফুটে ছিল আর সেই ফুলের পাশ দিয়েই সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে কয়েক জোড়া হাঁস। পুকুরটির পাড়েই বড় বড় গাছ, আর তার উপড়ে ছোট বড় নানান প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। আর সেখানেই একটি ঢিবির উপর মহাদেবের মন্দির।

দুই বন্ধু পুকুরের জলে নেমে হাত-মুখ পরিষ্কার করে মহাদেবের মন্দিরে গেল, সেখানে পুজো দিয়ে বাইরে এল। তারা বাইরে এসে দেখল এক রাজকুমারী ও তার বান্ধবীরা পুকুরে স্নান করছে। মন্ত্রীর ছেলে এটি দেখে সেখানেই এক গাছের নীচে বসে পড়ল, কিন্তু রাজকুমার সেখানে থাকতে পাড়ল না, তাই সে এগিয়ে যেতে লাগল। রাজকুমার সেই রাজকুমারীর দিকে দেখল এবং তার মনে হল যেন কোনো এক পরী পুকুরের জলে নেমেছে।

বিক্রম বেতালের গল্প
বিক্রম বেতালের গল্প রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম

রাজকুমারী রাজকুমারের দিকে চেয়ে একটি পদ্মফুল তার কানে রাখল এবং এরপর দাঁত দিয়ে সুতো কাটল এবং কয়েকটি পদ্ম বাঁধল এরপর একটি পদ্ম তার পায়ে রাখল। এরপর রাজকুমারের দিকে দেখে তার হাত বুকের উপর রাখল।

 কিছুক্ষণ পড় রাজকুমারী ও তার বান্ধবীরা সেখান থেকে চলে গেলে, রাজকুমার তার বন্ধুর কাছে এসে বলল-

“বন্ধু আমি এই রাজকুমারীকে ছাড়া থাকতে পাড়ব না। কিন্তু আমি তার নাম ঠিকানা কিছুই জানি না। জানিনা কিভাবে তার দেখা পাব!”

মন্ত্রীর পুত্র বলল, “কি যে বল বন্ধু, রাজকুমারী তো নিজেই তার পরিচয় দিয়ে গেল।”

রাজকুমার- “কখন বললো আমি তো কিছুই শুনলাম না।”

-বলেছে বন্ধু বলেছে, ইশারার মাধ্যমে বলেছে।

রাজকুমার- “কিভাবে?”

মন্ত্রীর পুত্র বলতে শুরু করল- “সে পদ্ম ফুল কানে দিয়েছে, অর্থাৎ সে কর্ণাটক রাজ্যের রাজকন্যা। দাঁত দিয়ে সুতো কাঁটা অর্থাৎ তার পিতার নাম দন্তবান। এরপর পায়ের উপর পদ্ম রাখা অর্থাৎ তার নাম পদ্মাবতী। শেষে তোমার দিকে দেখে তার হাত দুটি বুকে রাখা অর্থাৎ তোমাকে তার ভালো লেগেছে।”

এইসব শোনার পড় রাজার পুত্র খুবই আনন্দিত হলেন এবং বললেন, “আমাকে কর্ণাটক রাজ্যে নিয়ে চলো এক্ষনি।”

দুই বন্ধু কর্ণাটক রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে দিল, কিছুক্ষণ পড় তারা কর্ণাটক রাজ্যে পৌঁছে গেল। রাজমহলের কাছে গিয়ে তারা দেখল সেখানে এক বুড়ি চরকা কাটছে আর সুতো বুনছে।

ও রাজকুমারীর প্রেম edited
রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম

সেই বুড়িটির কাছে গিয়ে দুই বন্ধু ঘোড়া থেকে নেমে গেল এবং বলল- “আমরা ভিনদেশী সওদাগর। আমাদের জিনিসপত্র পিছনে একটি গরুর গাড়িতে আসছে, আমাদের থাকার জন্য কিছু বন্দোবস্ত করে দিলে ভালো হয়।”

রাজপুত্রের এরকম কথা শুনে বুড়ি সন্তুষ্ট হয়ে গেল, সে ভাবল এত সুন্দর এক ছেলে, তার উপর কথা বলার ধরনও খুব সুন্দর, এদের থাকতে দিলে খারাপ কিছু হবে না।

বুড়ি বলল- “বাবু আমার এই কুটিরকে তোমাদেরই বাড়ি ভাব, যত দিন মন চায় থাকো আমার কোনো আপত্তি নেই। এরপর দুই বন্ধু সেখানেই রয়ে গেল।”

মন্ত্রীর পুত্র বুড়িকে বলল- “মা, আপনি কি কাজ করেন? আপনার দিনপাতই বা কিভাবে হয়?” বুড়ি বলল- “বাবু, আমার এক ছেলে রাজ দরবারে চাকরি করে। আমিও একসময় রাজার একমাত্র রূপবতী কন্যা পদ্মাবতীর দেখাশোনার কাজ করতাম। এখন আমার বয়স হয়ে গেছে তাই রাজা মশাই আমাকে বিশ্রাম নিতে বলেছেন। আমার যা খরচ দরকার হয় রাজা মশাই দিয়ে দেন। আমি প্রতিদিন একবার রাজকুমারীকে দেখতে রাজমহলে যাই, আসলে ছোট বেলা থেকে তাকে দেখে এসেছি তো, তাই একবার না দেখলে মনে শান্তি হয়না।”

পড়ুনঃ- নতুন শিক্ষণীয় ছোট গল্প।

পঞ্চতন্ত্রের গল্প

এটি শুনে রাজকুমার সেই বৃদ্ধার হাঁতে কিছু অর্থ দিয়ে বলল- “মা, আপনি যখন আগামীকাল সেখানে যাবেন তখন রাজকুমারীকে বলবেন কিছুদিন আগে এক পুকুরের ধারে তুমি যাকে দেখেছিলে সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।”

পরেরদিন যখন সেই বৃদ্ধা রাজমহল গেল এবং রাজকুমারীকে রাজকুমারের কথা বলল তখন সেই কথা শুনতেই রাজকুমারী রেগে গিয়ে হাঁতে চন্দন নিয়ে বৃদ্ধাকে ছুঁড়ে মারল। এবং চেঁচিয়ে বলল- “আমার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে যাও।“

বৃদ্ধা রাজকুমারকে সব ঘটনা বলার পড়, মন্ত্রীর পুত্র বলল- “একদম ঘাবড়াবেন না, সে চন্দন ছুঁড়ে আপনাকে মেরেছে, চন্দন অর্থাৎ শুভ্র মানে পূর্ণিমা রাত, সে চন্দন ছুঁড়ে মেরেছে মানে, সে পূর্ণিমা রাতের পড়ের অন্ধকার রাতে রাজকুমারের সাথে দেখা করতে চেয়েছে।

কিছুদিন পড় রাজকুমার আবার বৃদ্ধাকে দিয়ে খবর পাঠালেন। এবার রাজকুমারী পায়ে আলতা দিচ্ছিলেন, আলতার বোতলে তিনটি আঙ্গুল ডুবিয়ে সে বৃদ্ধার দিকে ছিটিয়ে দিয়ে বলল- “এখান থেকে চলে যাও”

বৃদ্ধা এসে রাজকুমারকে সব কথা বললে রাজকুমার নিরাশ হয়ে যায়। মন্ত্রী পুত্র বলে- “কুমার এতে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই, সে আলতার বতলে তিনটি আঙ্গুল ডুবিয়ে দিয়ে বৃদ্ধার দিকে ছিটিয়ে দিয়েছিল অর্থাৎ সে বলতে চেয়েছে তার মাসিক সমস্যা চলছে তিনদিন অপেক্ষা কর।“

তিনদিন পড় বৃদ্ধাকে দিয়ে রাজকুমার আবার খবর পাঠাল, এবার রাজকুমারী তাকে রাজফটকের দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে বেড় হয়ে যেতে বলল। বৃদ্ধা এসে জানালে মন্ত্রী পুত্র জানায় “ব্যাস সমাধান হয়ে গেল। রাজকুমারী তোমাকে রাজমহলের দক্ষিণ দিকের ফটকের কাছে রাত্রে অপেক্ষা করতে বলেছে।”

খেলা edited
বুদ্ধির খেলা রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম image

রাজকুমার খুবই আনন্দিত হয়ে গেল, এবং সেদিন দুপুর রাতে সেখানে পৌঁছে গেল, সে দেখল জানালা খোলাই আছে, সে ভিতরে গিয়ে দেখল রাজকুমারী তখনও ঘুমায়নি এবং সে তার অপেক্ষা করছে। এরপর রাজকুমারী জানালা বন্ধ করে রাজকুমারকে তার কক্ষে নিয়ে গেল।

রাজকুমার রাজমহলের নানান জিনিস দেখে অবাক হয়ে যায়। কিছুদিন সে সেখানেই রাজকুমারীর সাথে কাঁটাতে থাকে। দিনের বেলা রাজকুমারী তাকে লুকিয়ে রাখত আর রাত হলেই তারা দুইজনে গল্পে মেতে উঠত। এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা দিন।

কিছুদিন পড় হঠাৎই রাজকুমারের তার বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল। সে ভাবতে লাগল তার বন্ধু কি অবস্থায় আছে!

রাজকুমারকে চিন্তিত দেখে রাজকুমারী তাকে চিন্তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাজকুমার জানায়- “সেই বৃদ্ধার বাড়িতে আমার এক বন্ধু আছে, কিজানি সে এখন কেমন আছে, সে অনেক চালাক, তার কারণেই আমি আজ তোমাকে কাছে পেয়েছি।“

রাজকুমারী কিছুটা নিরাশ হয়ে গেল এবং বলল- “ঠিক আছে, আমি তার জন্য কিছু বিশেষ খাবার বানিয়ে নিচ্ছি, তুমি এগুলি তাকে দিয়ে দেখা করে চলে এসো।“

খাবার নিয়ে রাজপুত্র তার বন্ধুর কাছে গেলে সে তার বন্ধুকে জানায়- “আমি রাজকুমারীকে তোমার চতুরতার কথা বলেছি, সে তোমার জন্য কিছু খাবার পাঠিয়েছে। এটি শোনার পড় মন্ত্রীর পুত্র বলল- “কাজটা তুমি ঠিক করনি বন্ধু, সে বুঝে গেছে যতদিন আমি আছি ততদিন সে তোমাকে নিজের করতে পাড়বে না। কারণ তুমি আমার চিন্তা করো। আর তাই সে এই খাবারে বিষ মিশিয়ে পাঠিয়েছে আমাকে মারার জন্য।“

বলতে বলতে মন্ত্রীর পুত্র একটি লাড্ডু উঠিয়ে বেড়ালকে দিল, বেড়ালটি সেটি খেতেই কাতরাতে কাতরাতে মারা গেল।

রাজপুত্র এটি দেখে খুবই খারাপ পেল। সে বলল-“যে আমার বন্ধুকে মারার ছক কষে সেই মেয়েকে আমার চাইনা, চল বন্ধু বাড়ি ফিরে যাই, পিতা মশাই হয়ত আমাদের চিন্তা করছেন।“

মন্ত্রীর পুত্র বলল- “উঁহু, না বন্ধু এখন এরকম করলে চলবে না, এখন আমাদের রাজকুমারীকে নিয়েই যেতে হবে, আজ রাত তুমি সেখানে যাও আর এই যে এই কালিটি নাও, এটি সহজে মিশে যাবে না। রাজকুমারী যখন ঘুমিয়ে যাবে তখন তার পায়ে একটি খড়গের চিহ্ন একে দিবে এরপর তার গয়না নিয়ে চলে আসবে।”

মন্ত্রীর পুত্রের কথা মতনই কাজ করল রাজকুমার। এরপর মন্ত্রীর পুত্র বলল- “আমি একজন তান্ত্রিকের মতো নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছি, আর তুমি হলে আমার ভৃত্য। কাল সকালে তুমি এই গয়না গুলি নিয়ে বাজারে যাবে এবং বিক্রি করতে চাইবে। রাজকুমারীর গয়না দোকানী অবশ্যই চিনবে এবং তোমাকে জিজ্ঞাসা করলে তুমি বলবে আমার গুরু আমাকে এগুলি বিক্রি করতে বলেছেন।“

পরের দিন সকালে রাজকুমার সেই গয়না গুলিকে নিয়ে রাজমহলের কাছেই এক গয়নার দোকানে বিক্রি করতে গেলেই দোকানী রাজকুমারীর গয়না গুলি চিনে ফেলে এবং রাজকুমারকে ধরে রেখে নগর রক্ষককে খবর দেন। নগর রক্ষক তাকে এই গয়না গুলি কোথায় পেয়েছে জিজ্ঞাসা করলে রাজকুমার মন্ত্রীর পুত্রের কথা মত বলে- “আমার গুরু আমাকে এগুলি বাজারে বিক্রি করতে বলেছেন।“ এরপর নগর রক্ষক তান্ত্রিকের বেশধারী মন্ত্রীর পুত্রকে ধরে নিয়ে আসে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে।

মন্ত্রীর পুত্র জানায়- “আমি শ্বশানে বসে ডাকিনী মন্ত্র পাঠ করছিলাম, আর তখনই ডাকিনী আসে। আমি তার সব গয়না খুলে নিয়ে নিই। এরপর তারপায়ে একটি খড়গের চিহ্ন বসিয়ে দিই।“

এটি শুনে নগররক্ষক দৌড়ে রাজমহলে গিয়ে রাজাকে সব কথা জানায় এবং রাজকুমারীর পায়ে তারা দেখে যে তার পায়ে একটি খড়গের চিহ্ন রয়েছে। এবং রাজকুমারী কিছুতেই বুঝতে পাড়ছিল না যে তার পায়ে এই চিহ্নটি কোথা থেকে এল!

এদিকে রাজা তান্ত্রিক বেশী মন্ত্রী পুত্রকে এককোনে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলে- “সাধুবাবা, আমাদের রাজপ্রাসাদে ডাকিনীর ছায়া পড়েছে এর থেকে নিস্তার পাবার উপায় কি?”

এরপর সাধুবেশী মন্ত্রীপুত্র জানায়- “রাস্তা একটাই, যদি নিজ রাজ্যকে বাঁচাতে চাও তাহলে নিজ কন্যাকে ত্যাগ করো।“

VIKRAM BETAL STORY BENGALI
VIKRAM BETAL STORY BENGALI বিক্রম বেতালের গল্প

এরপর রাজা রাজকুমারীকে নিয়ে সেই বনটিতে একাকী ছেড়ে দিয়ে আসে। এদিকে রাজপুত্র ও তার বন্ধু রাজকুমারীর দেখা করে এবং রাজকুমারীকে নিয়ে নিজ রাজ্যে চলে যায়। মহাআড়ম্বরে তাদের বিবাহের অনুষ্ঠান পালিত হয়। এভাবেই মন্ত্রী পুত্রের সহায়তায় রাজপুত্র রাজকুমারীকে কাছে পেয়ে যায়।

এখানে দেখতে গেলে আসল ভুলকার্য করেছে রাজকুমারীর বাবা। কারণ সে রাজা হয়েও কিছু বিচার না করেই নিজ কন্যাকে ত্যাগ করল। তাই অপরের কথায় ভোলার আগে সত্যতা যাচাই করে নেওয়াটা অনেক জরুরী।   

VIKRAM BETAL STORY BENGALI রাজকুমার ও রাজকুমারীর প্রেম বিক্রম বেতালের গল্প বুদ্ধির খেলা বিক্রম বেতালের গল্প


Spread the love

Leave a Reply