বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি শ্রেণী কক্ষ এবং একজন শ্রেণী শিক্ষক।

বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্পঃ- “মৃত্যুরহস্য”

রাত তখন আনুমানিক ১০ টা। সমানেই বেজে চলেছে M.R Ash এর বাড়ির কলিং বেল। এত রাতে কোনো মক্কেল আসার কথা নয়। M.R Ash. তখন রানির সাথে জমিয়ে গল্প করছিলেন, কলিং বেলের আওয়াজ তাদের গল্পে বাধার সৃষ্টি করল। রানি উঠে গিয়ে দরজা টা খুলে দিতেই, একজন লোক হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে বললেন- “জল প্লিজ একটু, দিন।“ রানি টেবিলে রাখা জলের বোতল টা লোকটার দিকে এগিয়ে দিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই M.R Ash. লোকটিকে বললেন- “আসুন এখানে বিশ্রাম গ্রহণ করুন।“

লোকটা ফর্সা ছিপছিপে গড়ন, বয়স প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই, মাথার চুল উসকোখুসকো। চোখ প্রায় এক সেন্টিমিটার ভিতরে চলে গেছে অর্থাৎ প্রায় ৫ দিন ধরে ভদ্র লোক ঠিক মত ঘুমাতে পারেন না। মুখ শুকনো দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে প্রবল দুশ্চিন্তায় তার দিন কাটছে।

লোকটা জল খেয়ে বোতলটা রানির হাতে দিয়ে বললেন- “ধন্যবাদ, মানে জল জন্য। দুঃখিত ধন্যবাদ জল এর জন্য।“ লোকটা গিয়ে M.R Ash এর সামনের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। M.R Ash বললেন- “আপনি নিশ্চয় পেশায় শিক্ষক এবং আপনি আজ সারাদিন পরীক্ষার খাতা দেখছিলেন।“

লোকটি পুরো অবাক হয়ে বললেন- “মানে কি করে, মানে বলতে উফফফ কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। মানে আপনি কি ভাবে জানলেন আমি শিক্ষক আর আমি পরীক্ষার খাতা দেখছিলাম!” M.R Ash বললেন, আপনি যখন জলের বোতল টা রানিকে দিচ্ছিলেন, তখন আপনার হাতের বুড়ো আঙ্গুল এবং তর্জনী চোখে আসল, আর দেখলাম আঙ্গুল গুলির মাথার চামড়া অনেক মোটা, আর এরকম মোটা চামড়া দীর্ঘ সময় কলম ধরে থাকলে হয়। আর আপনার হাতের তালুতে অসংখ্য লাল কালির দাগ জানান দিচ্ছে যে আপনি এই মাত্র এমন কিছু করে আসলেন যেখানে লাল কালির দরকার হয়।“

বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্প
বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্প

লোকটা পুরো অবাক হয়ে সব বিশ্লেষণ শুনছিলেন। M.R Ash রানিকে বললেন- “রানি ওনাকে একটু সরবত এনে দাও।“

রানি সরবত আনতে চলে যেতেই, লোকটি শুরু করলেন- “নমস্কার আমি সঞ্জীব সরকার, দক্ষিণ পাড়া হাইস্কুলের ইতিহাস শিক্ষক। বয়স ৫০ আর আমার বাড়ি হল স্কুলের পাশেই। বাড়িতে রয়েছে আমার স্ত্রী আর দুই মেয়ে।“

M.R Ash- হুম হুম বুঝলাম, বলুন কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি, আপনি এত রাতে ছুটে এসেছেন তারমানে কেসটা খুব জটিল।

সঞ্জীব বাবু বলতে শুরু করলেন- “আমি যে স্কুলে পড়াই সেই স্কুলে একটি ঘটনা আজব ঘটেছে। স্কুলের জল ধরেছে…”

M.R Ash- “আপনি থামুন একটু, আপনার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। রানিইই সরবত কোথায়!”

ওদিক থেকে আওয়াজ এলো- “আসছি”

রানি সরবত নিয়ে লোকটার হাতে দিল। লোকটা ধীরে ধীরে সবটা খেয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন- “আমি যে স্কুলে পড়াই সেই স্কুলের নাম হল দক্ষিণ পাড়া বালিকা বিদ্যালয়।“

পড়ুনঃ- রহস্যময় ফোন নাম্বার 

রানি- “ইয়ে মানে বলছিলাম যে, গ্লাস টা দিন”

সঞ্জীব বাবু কিছুটা লজ্জার ভাব নিয়ে গ্লাসটা রানিকে দিয়ে দিল। রানি সেটা টেবিলে রেখে, কুরকুরের প্যাকেট নিয়ে M.R Ash এর পাশে গিয়ে বসে পরল- “হুম বলুন এবার”

সঞ্জীব বাবু- “যেটা বলছিলাম, সেই বালিকা বিদ্যালয়ে পাঁচ দিন আগে আমার ক্লাসের হঠাৎ করেই ১৫ জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পরে, আর তাদের ভর্তি করানো হয় বাবুজি হসপিটালে, আজ দুপুরে ৮ জন ছাত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে।

পুলিশ আসে ময়না তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে, সেখানে তিব্র বিষ ক্রিয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে বলা হয়েছে। আর এদিকে এই সমস্ত কিছুর জন্য আমাকে দোষারোপ করা হয়েছে। আসলে আমি সেদিন ক্লাসে পড়া ধরছিলাম আর কেউই আমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছিল না, তাই মেজাজ বিগড়ে গেছে আমার আর একটা বেত নিয়ে সবাইকে পিটেছি।

আর এটিই হয়েছে দোষের, আমি নাকি লাঠি তে এমন কিছু তীব্র বিষ মিশিয়ে নিয়েছি, যা দিয়ে মারা মাত্রই ছাত্রীদের শরীরে বিষক্রিয়া হয়ে গেছে, আর তারা ইহলোক ত্যাগ করেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি এরকম কোন কাজ করিনি, আর আমি শুধুমাত্র ছাত্রীদের হাতের তালুতে হালকা করে মেরেছি।“

পড়ুনঃ- গোয়েন্দা গল্প- অদ্ভুতুড়ে বিজনেস 

এই বলে সঞ্জীব বাবু M.R Ash এর সামনে হাত জোড় করে বললেন- “প্লিজ বাঁচান আমাকে, আমি  নিরপরাধ, আমি কিছু করিনি আমার…” তিনি কথা শেষ করতে পারলেন না, কান্নায় ভেঙে পরলেন।

M.R Ash- “জল টা নিন, আর আপনি কিছু চিন্তা করবেন না, আপনি যদি নিরপরাধ হয়ে থাকেন আপনাকে কেউ কিছু করতে পারবে না।“

সঞ্জীব বাবু কিছুটা জল খেয়ে বললেন- “কেউ ইচ্ছে করে আমার ক্ষতি করতে চাইছে”

রহস্যের গোয়েন্দা গল্প
রহস্যের গোয়েন্দা গল্প

M.R Ash- এবার আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করি।

সঞ্জীব বাবু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললেন।

M.R Ash- মনে করুন তো আপনার ক্লাসে ছাত্রীদের মধ্যে এরকম কিছু আপনি ক্লাস নেওয়ার সময় লক্ষ্য করেছেন কি, যা আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে!

সঞ্জীব বাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- “সেরকম কিছু মনে পড়ছে না, তবে শেষ বেঞ্চ এর দুই জন তৃতীয় বেঞ্চ এর একজন এবং পাঁচ নাম্বার বেঞ্ছের দুইজন ছাত্রী ঝিমোচ্ছিল। আমি এর জন্য ওদের বকেছিও।

M.R Ash- আচ্ছা সেদিন ক্লাসে কতজন ছাত্রী উপস্থিত ছিল আপনার মনে আছে?

সঞ্জীব বাবু- ৫২ জন।

M.R Ash- ঠিক আছে ধন্যবাদ উত্তর গুলির জন্য, আমরা আপনার কেস টা নিচ্ছি, আর আমরা কাল সকালে মর্নিং ওয়াল্ক করতে গিয়ে স্কুলে যাব, আপনি যেভাবে হোক যার কাছে স্কুলের চাবি আছে কোনো বাহানায় তার থেকে চাবি নিয়ে আপনার ক্লাস রুম আর স্কুলের দরজা খুলে ভেজিয়ে রাখবেন।

পড়ুনঃ- অসাধারণ সব শিক্ষণীয় গল্প 

সঞ্জীব বাবু- স্কুলের চাবি আমার কাছেই থাকে, কারণ স্কুলের কাছে আমারই বাড়ি, কেরানি বাবু প্রতিদিন এসে আমার কাছে থেকে চাবি নিয়ে যান।

M.R Ash- বাঃ তাহলে তো বেশ সুবিধেই হল।

সঞ্জীব বাবু- ধন্যবাদ আপনাকে আমার এই কেসটি নেওয়ার জন্য, আমি সকালে স্কুলে আপনাদের অপেক্ষায় থাকব।

রানি- না না অত সকালে কষ্ট করে আপনার আসার দরকার নেই, আপনি আজ এখান থেকে বাড়ি যাওয়ার সময় স্কুলের দরজা খুলে রাখবেন, আমরা কাল দেখে নেব জায়গাটা।

সঞ্জীব বাবু- ঠিক আছে, আজ তাহলে উঠি। নমস্কার।

সঞ্জীব বাবু চলে যেতেই রানি  M.R Ash কে বলল- “তোমার কি মনে হচ্ছে, এতে কি স্কুলেরই কারও হাত থাকতে পারে!”

M.R Ash- হুম হুম থাকতে পারে।

রানি- তাহলে কি কেউ লোকটাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কেন!

M.R Ash- হুম হুম হতে পারে।

রানি- উফফ হুম হুম ছাড়া আর কোনো কথা নেই এনার।

M.R Ash- রাত যে অনেক হল সে খেয়াল আছে তোমার! আর এই কেস নিয়ে এখন ভাববো না, চলো ঘুমিয়ে পরি কাল সকালে গিয়ে সব দেখব তারপর ভাবব।

পরের দিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই M.R Ash এবং রানি সেই স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। স্কুলের দরজা খুলেই রেখেছেন সঞ্জীব বাবু। তারা ভিতরে গেলেন আর নীচের তলাতেই একটি রুমের খোলা রুমের দরজা তাদের নজরে এলো অর্থাৎ এটিই হল সঞ্জীব বাবুর ক্লাস রুম।

পড়ুনঃ- ভাই-বোনের ভালোবাসা 

তারা সেই ক্লাস রুমের দিকে পা বাড়াল। সেই ক্লাস রুম টি বেশ সু-সজ্জিত। ক্লাস রুমের পাশে রয়েছে একটি জলের ভাঁড়। এই ক্লাস রুমটি বাকি স্কুলটি থেকে আলাদা একদিকে অবস্থান করছে। তারা ক্লাস রুমের ভিতরে গিয়ে চারিদিকে ভালো মত দেখতে লাগলেন।

রানি ক্লাস রুমের প্রতিটি বেঞ্চ এর নীচে কি যেন দেখে চলেছে আর M.R Ash একমনে ক্লাস রুমের বাইরে থাকা জলের ভাঁড় টা দেখে চলেছে, সেখান থেকে কি মনে করে কিছুটা জল একটি নিজের জলের বতলের জল ফেলে দিয়ে সেখানে ভরে নিলেন। ক্লাস রুমের ভিতর থেকে রানি গোটা কয়েক জলের বতল নিয়ে এলো।

কিন্তু এই জলের বোতল ছাড়া আর তেমন কোন তথ্য তাদের হাতে এলো না। নিরাশ হয়েই তারা বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

সময় দুপুর ১ টা, M.R Ash এর ল্যাব থেকে একটা খুশির চিৎকার ভেসে এলো, রানি ছুটে গিয়ে দেখে, M.R Ash খুশিতে নাচানাচি করছে।

রানি- কি হলো হঠাৎ ব্যাঙের মত লাফাচ্ছ যে।

M.R Ash- লাফাচ্ছি কি আর সাধে, সঞ্জীব বাবুর খলনায়ক ধরা পরবে এবার।

bengali detective story
bengali detective story
<

রানি- মানে!

M.R Ash- ক্লাসের বাইরে রাখা জলের ভাঁড় থেকে জল নিয়েছি মনে আছে, সেটা পরীক্ষা করে দেখা গেল, অতে রয়েছে এন্ট্রিফকসাইড।

রানি- এটা আবার কি!

M.R Ash- বলছি। এন্ট্রিফকসাইড হল, একটি কিলার বিষ, এটিকে সাইলেন্ট কিলার ও বলা যায়। কেউ জলের সাথে এই অক্সাইড মিশিয়ে দিয়েছে। আমি আপাতত এটুকুই বলতে পারব। আর সেই জলের ভাঁড় থেকে গুটি কয়েক ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়েছি, সেগুলি ফটো প্লেটে আউটপুট করা আছে, আমি ঘোষবাবুকে সব দিয়ে দেব আজ যা করার উনিই করবেন। আর হুম, তুমি যে জলের বতল গুলো এনেছিলে, সেই জলের বোতল গুলিতেও এই অস্কাইড পাওয়া গেছে।

রানি- অবাক হয়ে বলল কিন্তু কারও ছাত্রদের উপর কি শত্রুতা থাকতে পারে!

M.R Ash- সব বোঝা যাবে, ঘোষ বাবুর কাছে।

পরের দিন রাতে ঘোষ বাবুর ফোন আসে তিনি বলতে থাকেন- “আপনার দেওয়া তথ্য মোতাবেক, আমি সেই স্কুলে অনুসন্ধান চালাই এবং বাথরুমে একটি প্যাকেট খুঁজে পাই যেটি লাল রঙের ছিল, সেটি  হরিহর পাড়া ল্যাব এ পাঠাই, সেটি নাকি এন্ট্রিফকসাইড এর প্যাকেট। এরপর সব কটা শিক্ষক- শিক্ষিকা কে জেরা করি। কিন্তু স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড টিচার তাকে কিছু বলার আগেই পালিয়ে যেতে থাকে।

পড়ুনঃ- হাসির গল্প- বউ জব্দ 

আমরা তাকে ধরে ফেলি এরপর তিনি বলেন- “সঞ্জীব বাবু পরের মাসে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে আসিন হবেন, কিন্তু এই পদে তার আসিন হওয়ার কথা। এই সময় তার মাথায় আসে, যেভাবেই হোক সঞ্জীব বাবুকে পথ থেকে সড়াতে হবে। আর এরপর তার মাথায় আসে, মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে তার পথের কাটা কে সাফ করতে হবে। যেহেতু তিনি রসায়ন এর শিক্ষক সেহতু এই সব অক্সাইড ফোকসাইড বিষয়ে তার অনেক জ্ঞান।

আর তিনি ছয় দিন আগে, স্কুল ছুটি হওয়ার পর, সঞ্জীব বাবুর ক্লাস রুমের বাইরে যে জলের ভাঁড় রয়েছে সেইখানে মিশিয়ে দিলেন এন্ট্রিফকসাইড। আর সেই অস্কাইড মিশ্রিত জল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পরল কিছু ছাত্রী। আর তারাই মারা গেছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এ শরীরে বিষ ক্রিয়ার কথাও উল্লেও আছে।“

রানি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল- সত্যি মানুষ আর মানুষ হল না। শুধু মাত্র নিজের স্বার্থ দেখতে গিয়ে এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণ বেঘোরে গেল।

গল্প পাঠাতে পারেন- charpatrablog@gmail.com -এ অথবা সরাসরি WhatsApp -এর মাধ্যমে এখানে ক্লিক করে। 

সমস্ত কপিরাইট ছাড়পত্র দ্বারা সংরক্ষিত। গল্পটির ভিডিও বা অডিও বা অন্য কোনো মাধ্যমে অন্যত্র প্রকাশ আইন বিরুদ্ধ। ছাড়পত্র এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হবে।

পড়ুনঃ- গোয়েন্দা অভিযান গল্প- দুর্গ রহস্য 

রহস্য গোয়েন্দা গল্প- ডিজিস
আমাদের সাথে যুক্ত হবেন যেভাবে- 

ফেসবুক Group - গল্প Junction 

ফেসবুক- ছাড়পত্র

টেলিগ্রাম- charpatraOfficial

WhatsApp Group- ছাড়পত্র (২)

বাংলা ছোট গোয়েন্দা গল্প। রহস্যের গোয়েন্দা গল্প। 1 new Mysterious bengali detective story

Spread the love

Leave a Reply